ছবি: চিত্ত মিডিয়া

ওকালতির পথ ছেড়ে কৃষি, প্রকৃতি ও মানুষের গল্প তুলে ধরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোচিত কনটেন্ট ক্রিয়েটর হয়ে উঠেছেন ঝিনাইদহের হরিণাকুণ্ডুর জুয়েল রানা। ফেসবুকে তাঁর পেজ ‘চিত্ত মিডিয়া’–র ফলোয়ার এখন ৩৫ লাখের বেশি। কোনো কোনো ভিডিওতে ভিউ ছাড়িয়েছে ২ থেকে ৩ কোটি।

                                                                               ছবি: চিত্ত মিডিয়া

২০২৫ সালের ৪ ফেব্রুয়ারি যাত্রা শুরু করা ‘চিত্ত মিডিয়া’ অল্প সময়েই দর্শকের হৃদয়ে জায়গা করে নিয়েছে। বর্তমানে পেজটিতে ১ হাজার ৩৫০টির বেশি ভিডিও রয়েছে এবং প্রতিদিন গড়ে তিনটি করে নতুন ভিডিও আপলোড করা হয়। পাশাপাশি ইউটিউবে তাঁর সাবস্ক্রাইবার প্রায় এক লাখ।

জুয়েল রানার কনটেন্টের মূল উপজীব্য কৃষি ও প্রকৃতি। তবে শুধু তথ্য নয়, গ্রামীণ জীবন, সাধারণ মানুষের সুখ-দুঃখ, দর্শন ও সাহিত্যকে কাব্যিক ভাষায় উপস্থাপন করাই তাঁর ভিডিওর বৈশিষ্ট্য। কখনো গরু দিয়ে হালচাষ করা একজন প্রবীণ কৃষকের জীবনসংগ্রাম, কখনো মাছের ঘেরের ওপর গোধূলিবেলায় ডানা শুকানো পানকৌড়ি ও সাদা বকের দৃশ্য—এসবের সঙ্গে যুক্ত হয় আল মাহমুদের কবিতা কিংবা জীবনবোধের গভীর উপলব্ধি।

একটি ভিডিওতে ঝড়ে হেলে পড়া খেজুরগাছের গল্প বলতে গিয়ে তিনি বলেন, “টিকে থাকার ইচ্ছাটা আগে নিজের থাকতে হবে।” আবার কোনো ভিডিওতে প্রকৃতির নীরব ভাষা ধরতে ঘুঘু বা শেয়ালের ডাক রেকর্ড করার জন্য ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করেছেন তিনি।

২০১৮ সালে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগ থেকে স্নাতকোত্তর শেষ করে প্রায় চার বছর ওকালতির চেষ্টা করেন জুয়েল রানা। তবে চাকরি কিংবা ওকালতি—কোনোটিই তাঁর জীবনের তৃপ্তির জায়গা ছিল না। কৃষক পরিবারের সন্তান হিসেবে ছোটবেলা থেকেই মাটি ও প্রকৃতির সঙ্গে তাঁর নিবিড় সম্পর্ক। সেই অভিজ্ঞতা ও অনুভব থেকেই জন্ম নেয় ‘চিত্ত মিডিয়া’।

জুয়েলের ভাষায়, “কৃষকের গল্প, সমস্যা আর ঋতুবৈচিত্র্য তুলে ধরলে কৃষি হয়ে ওঠে এক প্রাণবন্ত শিল্প।” তিনি মনে করেন, জ্ঞান ও বিনোদনের পাশাপাশি কৃষকের জীবনকে ঘিরে একটি দার্শনিক বোধ তৈরি করাই তাঁর কাজের মূল উদ্দেশ্য।

ঝিনাইদহ ও চুয়াডাঙ্গা অঞ্চলের বিভিন্ন গ্রাম ঘুরে ভিডিও ধারণ করেন জুয়েল ও তাঁর দুই সহযোগী ইকরামুল কবির ও হাসানুজ্জামান। তবে কাজের বড় চ্যালেঞ্জ হলো গ্রামবাসীর আস্থা অর্জন। অনেকেই ক্যামেরার সামনে কথা বলতে ভয় পান। তবু ধৈর্য আর আন্তরিকতায় তিনি সাধারণ মানুষের জীবনবোধ তুলে ধরার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন।

দর্শকদের কেউ যখন বলেন, তাঁর ভিডিও দেখে শৈশবের গ্রামীণ জীবন মনে পড়ে—তখনই নিজেকে সার্থক মনে করেন জুয়েল রানা। তিনি বলেন, “সবাই যদি চাকরি করে, তাহলে পৃথিবীর রূপ-রসের বর্ণনা করবে কে? এর জন্য তো দু-একটা পাগল থাকা চাই!”

স্ত্রী নিশা ও তিন বছরের কন্যা জেসিকে নিয়ে ঝিনাইদহ শহরে বসবাস করেন জুয়েল রানা। বাবা-মা ও এক বোন থাকেন গ্রামের বাড়িতে। গ্রামীণ জীবন, কৃষকের গল্প আর প্রকৃতির ভাষা মিলিয়ে তিনি গড়ে তুলছেন এমন এক প্ল্যাটফর্ম, যেখানে একসঙ্গে উপস্থিত মানবিকতা, শিক্ষা ও বিনোদন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *