

বিশাল বটগাছের নিচে জমে উঠেছে এক ভিন্ন রকম বাজার। সার বেঁধে বসে আছেন যুবক থেকে বৃদ্ধ। সবার সামনেই দুটি করে মাটির হাঁড়ি। একে একে ক্রেতারা এগিয়ে আসছেন। কারও হাতে প্লাস্টিকের বয়াম, কারও হাতে ছোট-বড় পাত্র। হাঁড়ির মুখ খুলে দেখা যাচ্ছে—সেই পরিচিত দৃশ্য—ঘন, সাদা ও দুধের ঘ্রাণে ভরা মহিষের টক দই।
এই চিত্র জামালপুরের সীমান্তবর্তী বকশীগঞ্জের নঈম মিয়ার হাটের। পুরোপুরি সনাতন পদ্ধতিতে ঘরে তৈরি এই টক দই। প্রায় শত বছরের পুরোনো এই দইয়ের ঐতিহ্য আজও এ জনপদের স্বাদ-সংস্কৃতির এক জীবন্ত প্রতীক হয়ে টিকে আছে।
উপজেলা শহর থেকে সাত কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে নঈম মিয়ার বিশাল হাট। গত ৮ নভেম্বর সরেজমিনে দেখা যায়, হাটের পূর্ব পাশে ঈদগাহ মাঠের বিশাল বটগাছ। গাছের নিচে দইয়ের হাঁড়ি নিয়ে বসে আছেন বিক্রেতারা। উপজেলা ও জেলা শহরের বিভিন্ন জায়গা থেকে ক্রেতারা এই দই কিনতে আসছেন। দরদাম ও দই ঘনত্ব দেখে ক্রেতারা কিনে নিয়ে যাচ্ছেন। প্রতি সপ্তাহের শনি ও মঙ্গলবার দুপুর ১২টা থেকে সন্ধ্যার পর পর্যন্ত চলে এ দইয়ের হাট। সাধারণত প্রতি কেজি দই ১৬০ থেকে ১৮০ টাকায় বিক্রি হয়।
যেভাবে তৈরি হয় মহিষের দই
কয়েকজন বিক্রেতা দই তৈরির পদ্ধতিটা জানান, গরুর দুধের মতো মহিষের দুধ দীর্ঘক্ষণ জ্বাল দেওয়ার বা আলাদা করে দইয়ের বীজ মেশানোর প্রয়োজন হয় না। প্রথমে মহিষের দুধ সংগ্রহ করা হয়। এরপর পরিষ্কার মাটির হাঁড়িতে দুধ ঢাকনা দিয়ে ঢেকে রাখা হয়। এভাবেই তিন দিন রেখে দেওয়া হয়। তিন দিন পর হাঁড়ির ঢাকনা খোলার পর দই পাওয়া যায়। এর উচ্চ ফ্যাট ও ঘনত্বের কারণে এটি রেখে দিলে এমনিতেই জমে যায়। এতে খুব সহজেই মহিষের দুধের দই তৈরি হয়। কোনো কৃত্রিম উপকরণ সংযোজন, অতিরিক্ত তাপ বা রাসায়নিক ছাড়াই একদম প্রাকৃতিকভাবেই জমে দইয়ে পরিণত হয়। এতে এই দইয়ের প্রাকৃতিক স্বাদ ও বিশুদ্ধতা অটুট থাকে।
আকার অনুযায়ী প্রতিটি মাটির পাত্রে ২ থেকে ১৫ কেজি পর্যন্ত দই তৈরি হয়। প্রতি কেজি দই উৎপাদনে এক লিটারের কিছুটা বেশি দুধের প্রয়োজন হয়। প্রতিটি মহিষ থেকে ৪ থেকে ১০ লিটার পর্যন্ত দুধ পাওয়া যায়। প্রতি কেজি দই বিক্রি হয় ১৬০ থেকে ১৮০ টাকা পর্যন্ত। স্বাভাবিকভাবে এই টক দইয়ের গুণগত মান এক সপ্তাহ পর্যন্ত বজায় থাকে।
উপজেলার মালিরচর এলাকার বাচ্চু মিয়া বলেন, ‘আমাদের দই একেবারে মহিষের তাজা খাঁটি দুধ দিয়ে তৈরি হয়। কোনো ভেজাল নেই। কোনো রং বা কেমিক্যাল ছাড়াই মহিষের খাঁটি দুধ দিয়ে এই দই তৈরি করা হয়। প্রথমে মাটির হাঁড়ি ভালোভাবে পরিষ্কার করে হাঁড়িতে সামান্য পরিমাণ শর্ষের তেল মেখে নিয়ে রোদ বা চুলার তাপে শুকিয়ে তাজা মহিষের দুধ ভালোভাবে ছাঁকনি দিয়ে ছেঁকে তারপর হাঁড়িতে রেখে দিতে হয়। তিন দিনের মধ্যে সুন্দর স্বাদের দইয়ে পরিণত হয়। একটি হাঁড়িতে ২ থেকে ১৫ লিটার পর্যন্ত দই বসানো যায়।’

উৎসবে আনে পূর্ণতা
বকশীগঞ্জে মহিষ পালন করা হয়। মহিষের দুধের চেয়ে দইয়ের চাহিদা ব্যাপক হওয়ায় এ অঞ্চলে মহিষ লালন-পালনে প্রসার ঘটেছে। কোনো খামার নয়, কৃষকের বাড়িতে ও গ্রামীণ পরিবেশে পথে-প্রান্তরে সাধারণভাবেই মহিষ লালন-পালন হয়। এসব মহিষ থেকে খুবই উৎকৃষ্ট মানের দুধ উৎপাদন করা হয়, যা টক দইয়ের প্রধান উপকরণ।
এ অঞ্চলের মানুষের খাদ্যসংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠেছে এই দই। এটি ভাতের সঙ্গে খাওয়া হয়, চিড়া-মুড়ির সঙ্গে মিশিয়ে তৈরি হয় মুখরোচক খাবার, আবার গরমের দিনে দই, পানি ও চিনি মিশিয়ে তৈরি করা হয় ঘোল, যা শরীরকে শীতল রাখে। ভাতের সঙ্গে দই ও খেজুরের গুড় এ অঞ্চলের জনপ্রিয় একটি খাবার। এ অঞ্চলের মানুষের দৈনন্দিন খাদ্যতালিকায় থাকে এই দই। এ ছাড়া অতিথি আপ্যায়নের অন্যতম প্রধান উপাদান এটি। উৎসব-পার্বণ, বিয়েশাদি কিংবা যেকোনো সামাজিক আয়োজনে এ দই ছাড়া যেন এ অঞ্চলের কোনো উৎসব পূর্ণতা পায় না।
বহু দূর থেকে মানুষ দই কিনতে আসেন
উপজেলার বাট্টোজোড় এলাকার আবদুর রহমান প্রায় ৩৫ বছর ধরে এই হাটে মহিষের দই বিক্রি করছেন। তিনি বলেন, তাঁরা নিজেরাই মহিষ লালন-পালন করেন। সেই মহিষের দুধ দিয়ে নিজেরাই দই বানান। একটি মহিষ ১০ থেকে ১২ কেজি দুধ দেয়। এখানে মহিষের দুধ খাওয়ার প্রচলন তেমন একটা নেই। এখানে সবাই মহিষের দই খান। দিন যত যাচ্ছে এই দইয়ের জনপ্রিয়তা আরও বাড়ছে। এখন হাটে বহু দূর থেকেও মানুষ দই কিনতে আসেন। বেচাবিক্রি অনেক ভালো।
উপজেলার বাঙ্গালপাড়া গ্রামের মো. যুবরাজ দুটি মাটির হাঁড়ি ভরে নঈম মিয়ার দই নিয়ে বাজারে এসেছেন। কয়েক ঘণ্টার মধ্যে তাঁর একটি হাঁড়ির পুরো দই বিক্রি হয়ে গেছে। তিনি বলেন, ‘শত বছর ধরে এই হাটে দই বিক্রি চলে। আমার দাদা ও পরে বাবা এবং এখন আমি এই দই বিক্রি করছি। প্রতি হাটে ১০–১৫ মণ দই বিক্রি করি। এই দই সবার সেরা। এই বাজারে শুধু মহিষের দই পাওয়া যায়। এই দই ঢাকা, ময়মনসিংহ, কুড়িগ্রাম, রাজীবপুর, শেরপুরসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে যায়। এই দইয়ের খ্যাতি এখন দেশজুড়েই রয়েছে।’
জামালপুর শহর থেকে নঈম মিয়ার হাটে দই কিনতে এসেছেন আজাদ মিয়া (৪৫)। সঙ্গে তাঁর স্ত্রী ও সন্তানও রয়েছেন। তিনি বলেন, ‘এই বাজারের মহিষের টক দইয়ের নাম অনেকের মুখেই শুনেছি। প্রতিবেশী একজন প্রায়ই এই দই কিনে নিয়ে যান। তাঁরা আমাদের বাসায় দিয়েছিলেন। খেতে অসাধারণ লাগে। আজ অফিস বন্ধের দিনে ঘুরতে ঘুরতে চলে এসেছি দই কিনতে।’
